• Sat, ০৭ Mar ২০২৬, ০১:১০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

কার্যকর ঐক্য হলে রাষ্ট্রক্ষমতা আমাদের হাতেই আসবে: চরমোনাই পীর

স্টাফ রিপোর্টার
আপডেট : শনিবার, ২৮ জুন, ২০২৫

আগামী নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর পাশাপাশি দেশপ্রেমিক বিভিন্ন দল নিয়ে ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ও চরমোনাইর পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, এই ঐক্য গড়তে পারলে আগামী দিনে আমাদের হাতেই আসবে রাষ্ট্রক্ষমতা।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আয়োজিত মহাসমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চরমোনাইর পীর বলেন, ‘আমরা বারবার রক্ত দিয়েছি, কিন্তু সফলতা পাই নাই। কারণ, আমরা প্রতিবারই নেতা ও নীতি বাছাই করতে ভুল করেছি। আমরা ৫৪ বছরে অনেক দলকে দেশ শাসন করতে দেখেছি। কিন্তু ইসলামকে এখনো ক্ষমতায় নিতে পারি নাই। এবার ইসলামপন্থীদের ঐক্যের ব্যাপারে গণপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।’
ইসলামী আন্দোলনের আমীর বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই ইসলামপন্থী সকল ভোট একবাক্সে আনার কথা বলে আসছি। আগামী নির্বাচনে শুধু ইসলামি দলই নয়, বরং দেশপ্রেমিক আরও অনেক রাজনৈতিক দলও একবাক্স নীতিতে আসতে পারে, ইনশাআল্লাহ। যদি আমরা একত্রে নির্বাচন করতে পারি, যদি কার্যকর ঐক্য গড়ে তুলতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরাই হবে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব আমাদের হাতেই আসবে ইনশাআল্লাহ।’

চরমোনাই পীর বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দিতে হবে। যে যত শতাংশ ভোট পাবে তাদের তত শতাংশ প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এটা এখন জনগণের দাবি, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের দাবি।’ এসময় তিনি বিএনপিকেও পিআর সিস্টেমে নির্বাচনে আসা উচিত বলে মত দেন।
রেজাউল করীম বলেন, ‘জুলাই অদ্ভ্যুত্থানের পর সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। সংস্কার নিয়ে এখন দ্বিতীয় দফা আলোচনা চলছে। আমরা দেখছি মৌলিক সংস্কারে কেউ কেউ আপত্তি করছেন। এটা দ্বিমুখিতা। সংস্কার না হলে গণভোটের আয়োজন করতে হবে।’
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট জুলুমের রাষ্ট্র তৈরি করেছিল। তারা লাখ লাখ মানুষ খুন, গুম করেছে। তাদের কোনো ক্ষমা নাই। যারা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধে জড়িত ছিল তাদের বিচার করতে হবে। ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত সকলকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
ইসলামী আন্দোলনের আমীর বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ কোনো দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, চাঁদাবাজকে সরকারে চায় না। চাঁদাবাজি, খুন করার জন্য, দখলের জন্য চব্বিশে এসে জীবন দেয়নি। বাংলাদেশের মানুষ খুন হবে না, গুম হবে না। ইসলামি দল ক্ষমতায় গেলে কাউকে চাঁদা দিতে হবে না, বাংলাদেশ মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে।’
মুফতি রেজাউল করীম বলেন, ‘যারা মোল্লাদের দাড়ি টুপি নিয়ে গালি দেবে তাদের ক্ষমতায় আমরা যেতে দেব না। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের গোলামি করার জন্য জীবন দেয় নাই, রক্ত দেয় নাই। বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিতে পারে কিন্তু কারও গোলামি করতে পারে না। মঞ্চে যারা আছেন তারা যদি একসঙ্গে থাকেন, কথা রাখেন, তবে আগামীতে ইসলামি শক্তি ক্ষমতায় যাবে।’

মহাসমাবেশে জামায়াতে ইসলামী-এনসিপি-হিন্দু মহাজোটের নেতারা: এদিকে ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশে যোগ দেন জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা। এছাড়া মহাসমাবেশ হিন্দ্,ু বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সংগঠনের নেতারাও ছিলেন। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের বিরোধী হওয়ায় বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানায়নি ইসলামী আন্দোলন। দুপুর দুইটায় শুরু হয় লাখো মানুষের এ সমাবেশ।
জামায়াত নেতাদের মধ্যে সমাবেশে ছিলেন দলটির নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার, সহকারী সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান। যোগ দেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, গণঅধিকার সভাপতি নুরুল হক নূর, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মূখ্য সংগঠক সারজিস আলম, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মূসা বিন ইজহার, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমাদ আবদুল কাদের মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট মহাসচিব মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজি, বাংলাদেশ খেলাফত মহাসচিব জালাল উদ্দীন, খেলাফত আন্দোলন মহসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানি প্রমুখ।
মহাসমাবেশে যোগ দেন জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, বোধিজ্ঞান ভাবনাকেন্ত্রের সভাপতি দয়াল কুমার বড়ুয়া, বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও।

আগে স্থানীয় নির্বাচনসহ ১৬ দাবি: এদিকে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বণ্টন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ ১৬ দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপের সংলাপে বাস্তবায়নের জন্য এ দাবি জানানো হয়। এগুলো হলো-
১. সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের সঙ্গে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি’ এ বিষয়টি অবশ্যই পুনঃস্থাপন করতে হবে। ২. সংসদের প্রস্তাবিত উভয়কক্ষে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন দিতে হবে। ৩. গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে আগামী জুলাই মাসের মধ্যে জুলাই সনদ ঘোষণা করতে হবে। ৪. নির্বাচিত স্বৈরাচার, দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ও সন্ত্রাসী শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংস করতে না পারে এবং একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনী মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ৫. সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। ফ্যাসিবাদের সহযোগী চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণ করতে হবে। ৬. পতিত ফ্যাসিবাদের বিচার নিশ্চিতে বিদেশে পালাতক অপরাধীদের আটকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। ৭. দেশ থেকে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে সক্রিয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ৮. দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও খুনখারাবি রোধে প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও অবিচল হতে হবে। ৯. ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে ও দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে। ১০. জাতীয় নির্বাচনের আগে সব স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আগামীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনের বিধান প্রণয়ন করতে হবে। ১১. চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি ও সন্ত্রাসীদেরকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। ১২. জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বে অবশ্যই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ১৩. ঘুষ, দূর্নীতিসহ সকল প্রকার নাগরিক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক কারণে হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ করতে হবে। হয়রানিমূলক সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। দেশের কোথাও কোনো রকম মব সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া যাবে না। মব সৃষ্টিকারীদের দমনে যথাযথ আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ১৪. দেশ বিরোধী ও ইসলাম বিরোধী সব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবিলায় সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। ১৫. জাতীয় নির্বাচনে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক ও ইসলামী শক্তির ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। ১৬. স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, জনগণের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষা, সর্বত্র শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং কাক্সিক্ষত উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে সকল পর্যায়ে ইসলামের সুমহান আদর্শের অনুশীলন করতে হবে।


বিভাগের আরোও সংবাদ